শেয়ার বাজার

গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের-আইসিজে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৪

গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের-আইসিজে

বার্তাবেলা আন্তর্জাতিক ডেস্ক: তবে গাজায় ইসরালের সামরিক অভিযান বন্ধের যে আদেশ দক্ষিণ আফ্রিকা চেয়েছিল, তাতে সায় দেয়নি জাতিসংঘের এ সর্বোচ্চ আদালত।

ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত। শুক্রবারের (২৬ জানুয়ারি) এই রায়ে বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার বাহিনী গাজায় আর গণহত্যা চালাবে না ও ‘কথিত’ গণহত্যার প্রমাণ সংরক্ষণ নিশ্চিত করবে।

শুক্রবার গাজা উপত্যকায় গণহত্যা নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলার রুল জারি করেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত। এতে গাজায় গণহত্যা বন্ধে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইসরায়েলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে গাজায় ইসরায়েলকে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের নির্দেশ আদালত দেননি।

শুক্রবার (২৬ জানুয়ারি) দেওয়া অন্তবর্তীকালীন রায়ে আদালতের প্রেসিডেন্ট মার্কিন বিচারক জে দোঙ্গু বলেন, গাজায় যাতে গণহত্যা না ঘটে সেজন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইসরায়েলকে নির্দেশ দিচ্ছেন আদালত। একই সঙ্গে গাজায় মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়নে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে ইসরায়েলকেই।

রায়ে আরও বলা হয়, গাজা উপত্যকায় পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে দিতে হবে ও গাজার সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে হবে। এছাড়া ইসরায়েলকে এক মাসের মধ্যে গাজায় ত্রাণ পৌঁছানো ও গণহত্যা প্রতিরোধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আদালতের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

আইসিজে তার অন্তবর্তীকালীন রায়ে আরও বলেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার যে অভিযোগ তুলেছে, সেসব অভিযোগের সঙ্গে কিছু বিষয়ের মিল রয়েছে। এ কারণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এ মামলা চলবে।

আরও পড়ুন: গাজার ক্ষুধার্ত মায়েদের বুকে দুধ নেই, অনাহারে লাখ লাখ শিশু

আইসেজি’র বিচারক জে দোঙ্গু এর আগে বলেছিলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে করা মামলায় রায় দেওয়ার ক্ষমতা এই আদালতের রয়েছে ও ইসরায়েলের অনুরোধে আমরা এই মামলা খারিজ করে দেবো না।

গাজায় নির্বচারে হামলা ও গণহত্যার অভিযোগে ইসরায়েলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে গত বছরের শেষদিকে আইসিজেতে মামলা করে দক্ষিণ আফ্রিকা। চলতি মাসের শুরুতে আদালতে মামলাটির দুই দিনের শুনানি হয়।

শুনানিতে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়, আদালত যেন জরুরি ভিত্তিতে ইসরায়েলকে গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধের নির্দেশ দেন। এছাড়া জেনোসাইড (গণহত্যা) কনভেনশনের আওতায় ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের সুরক্ষার বিষয়টিও যাতে নিশ্চিত করা হয়।

দখলদার ইসরায়েল আদালতকে এই মামলা সরাসরি খারিজ করে দিতে বলেছিল। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছিলেন, তারা আশা করছেন, জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত এই মিথ্যা অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করবেন।

কিন্তু আইসিজের এই রায়ে ইসরায়েলের সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। উল্টো আইসিজের ১৭ জনের বিচারক প্যানেলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। শুধু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কার্যকলাপ ও পদক্ষেপ দ্রুত বন্ধের আদেশ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা যা চেয়েছিল তার বেশিরভাগই পূরণ হয়েছে রায়ে। 

সূত্র: আল জাজিরা

Dummy Ad 1

আন্তর্জাতিক কফি দিবস:
কেন পুরো পৃথিবী কফির প্রেমে পড়লো?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬

কেন পুরো পৃথিবী কফির প্রেমে পড়লো?

বিশেষ প্রতিবেদন: প্রচলিত একটি গল্প অনুযায়ী, নবম শতকে ইথিওপিয়ার এক ছাগলপালক ছিলেন কালদি। তিনি লক্ষ করেন, একটি বিশেষ গাছের ফল খাওয়ার পর তার ছাগলগুলো অস্বাভাবিকভাবে চঞ্চল হয়ে উঠছে এবং রাতে ঘুমাতেও চাইছে না।

কালদি বিষয়টি স্থানীয় এক মঠের ধর্মগুরুকে জানান। দীর্ঘ সময়ের প্রার্থনার সময় জেগে থাকতে সমস্যায় পড়া সেই ধর্মগুরু কফির ফল দিয়ে পানীয় তৈরি করেন। গল্প অনুযায়ী, পানীয়টি তাকে সতর্ক ও জেগে থাকতে সাহায্য করে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে কফির চাঙা করে দেওয়ার বৈশিষ্ট্যের কথা ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত নয়।

"আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কফি দিবস। বিশ্বজুড়ে কফি এখন শুধু একটি পানীয় নয়, এটি এখন শহুরে সংস্কৃতির বড় একটি অংশ। বাংলাদেশেও তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে কর্মব্যস্ত মানুষের কাছে কফির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। পুরনো বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা, ব্যাবসায়িক বৈঠক কিংবা নতুন কারও সঙ্গে প্রথম দেখা—কফি যেন নানা মুহূর্তের নীরব সঙ্গী"

এসপ্রেসো, ক্যাপুচিনো, মোচা, ডিক্যাফ কিংবা ফিল্টার কফি—পছন্দের ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু কফিকে ঘিরে মানুষের ভালোবাসা বিশ্বজুড়েই পরিচিত। সেই ভালোবাসা উদ্‌যাপনেই প্রতিবছর ১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কফি দিবস। আন্তর্জাতিক কফি সংস্থা ২০১৫ সালে দিবসটি চালু করে।


  • কফি বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক জনপ্রিয় পানীয় এবং বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হওয়া পণ্যগুলোর মধ্যে একটি। বিশ্বব্যাপী কফি খামারগুলোর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই ক্ষুদ্রচাষিদের মালিকানাধীন বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ পর্যন্ত কৃষক ও তাঁদের পরিবারের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করছে কফি খাত। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২,০০০ টন কফি ব্যবহৃত হয় এবং গত এক দশকে এর চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং গড়ে প্রায় ৫৬% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।


আরব বিশ্বে কফির উত্থান

বাণিজ্যপথে কফি ইথিওপিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ১৪৫০ সালের মধ্যে সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া ও পারস্যে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইয়েমেন হয়ে ওঠে কফি চাষের প্রধান কেন্দ্র। ষোলো শতকে কফি আরব বিশ্বের ‘বেভারেজ অব চয়েজ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

তবে কফি নিয়ে বিতর্কও কম ছিল না। ১৫১১ সালে মক্কায় কফি পান ধর্মীয়ভাবে বৈধ কিনা, তা নিয়ে আদালতে বিতর্ক হয়। শেষ পর্যন্ত এটি বৈধ ঘোষণা করা হলে দ্রুত কফিহাউজ সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে—যেখানে আড্ডা, আলোচনা ও কখনো বিপ্লবী চিন্তার জন্ম হতো।

ইউরোপে কফির আগমন

অটোমান সাম্রাজ্যের হাত ধরে কফি ইউরোপে পৌঁছায়। ১৬৫০-এর দশকে লন্ডনে প্রথম কফিহাউজ খোলা হয়। অল্প সময়েই এগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ফ্রান্সে কফির সঙ্গে দুধ ও চিনি মেশানোর প্রচলন শুরু হয়, আর প্যারিসের কফিহাউজগুলো দার্শনিকদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়।

ভারত ও এশিয়ায় কফির বিস্তার

একটি রোমাঞ্চকর গল্প জড়িয়ে আছে ভারতের কফি ইতিহাসে। ‘বাবা বুদান’ নামের এক সুফি সাধক মক্কা থেকে গোপনে সাতটি কফি বীজ নিয়ে এসে কর্ণাটকের চিকমগলুর অঞ্চলে রোপণ করেন। সেখান থেকেই ভারতে কফি চাষের সূচনা হয়, যা পরে ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে।


জ্বালানী তেলের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিক্রিত পণ্য এবং বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বেশি পানকৃত পানীয়র মধ্যে অন্যতম নাম কফি।  এই কফি বিশ্বের সর্বত্র ব্যাপকভাবে প্রচলিত উত্তেজক পানীয় হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। 

কফির ইংরেজি নাম : Coffee। কফি চেরি নামক এক ধরনের ফলের বীজ যা "কফি বীজ" নামে পরিচিত তা পুড়িয়ে গুঁড়ো মিশিয়ে কফি তৈরি হয়। কফিতে ক্যাফেইন নামক এক প্রকার উত্তেজক পদার্থ রয়েছে। ৮ আউন্স কফিতে প্রায় ১৩৫ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। মজার বিষয় হলো, কফি গাছ নিজেকে রক্ষার জন্যই ক্যাফেইন তৈরি করে—যা পোকামাকড়ের জন্য বিষের মতো কাজ করে, আবার মৌমাছিকে আকৃষ্ট করে পরাগায়নে সাহায্য করে।

কফির উপাদান ক্যাফেইনের জন্যে কফি মানুষের উপর উত্তেজক প্রভাব ফেলে ও উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। চায়ের পরই কফি বিশ্বের অত্যধিক জনপিয় পানীয়।

কফি আবিষ্কার নিয়ে একটি মজার কাহিনী প্রচলিত আছে । আরবে প্রচলিত আছে, বহু শতাব্দী আগে কালদি নামের এক মেষপালক একদিন দেখল তার মেষ ও ছাগলগুলো অদ্ভুত ধরনের আচরণ করছে। এ ঘটনা দেখে সে বোঝার চেষ্টা করল কেন তারা এমনটি করছে। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখল মেষ ও ছাগলগুলো সবুজ এক প্রকার উদ্ভিদের লালচে ফল খাচ্ছে এবং চারদিকে লাফালাফি ছোটাছুটি করছে।  


মেষপালক দেখল, বড় মেষগুলোও ছোট শাবকদের মতো লাফালাফি ছোটাছুটি আর দুষ্টুমি করছে। এ ঘটনা দেখে মেষপালক নিজেই এ ফল খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। খাওয়ার পর নিজেকেও ওই মেষগুলোর মতো প্রাণবন্ত মনে হলো। পরে কালদি তার মালিকের কাছে এ অভিজ্ঞতার কথা জানাল। তার মালিকও সেই ফল খেয়ে একই রকম অনুভব করল। পরে জানা গেল, এ ফল ছিল আসলে কফি ফল। 

এই ঘটনার কোনো সত্য দলিল না থাকলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানাযায়-  ষোড়শ শতকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কফি পানের প্রচলন শুরু হয়। এর পর কফি ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে।

কফি আজ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়গুলোর একটি। ক্যাফেইনকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত উদ্দীপক। কিন্তু এই কালো পানীয়ের কাপে লুকিয়ে আছে এক জটিল ইতিহাস—যেখানে আছে সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ, বিপ্লব আর সংস্কৃতির বিবর্তন।

কফির বিশ্বজয়ের গল্প যতটা মুগ্ধতার, ততটাই অন্ধকার। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ক্যারিবীয় অঞ্চল, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার বিশাল কফি বাগানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো। এসব বাগানে চালানো হতো নির্মম দাসপ্রথা ও অমানবিক শ্রম শোষণ। লাতিন আমেরিকায় কফি চাষের জন্য উচ্ছেদ করা হয় স্থানীয় আদিবাসীদের, উজাড় করা হয় বিশাল বনভূমি।

তবু কফি থেমে থাকেনি। এটি একদিকে গড়ে তুলেছে বিশাল অর্থনীতি, অন্যদিকে ধ্বংস করেছে বাস্তুতন্ত্র। যুগে যুগে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি এটি জ্বালানি জুগিয়েছে বহু বিপ্লবেও। কখনো একে ঈশ্বরের আশীর্বাদ মনে করা হয়েছে, আবার কখনো দেখা হয়েছে পাপের উৎস হিসেবে। শেষ পর্যন্ত, এই রোস্টেড দানার আকর্ষণের কাছে নতি স্বীকার করেছে পুরো মানবজাতি।

এবার জানুন কফি সম্পর্কে কিছু তথ্য। কফির আদি নিবাস ইথিওপিয়ায়। তবে আরবে ১৪ শতকের দিকে কফির চাষ করা হতো বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৫ শতকের দিকে আরবরা সর্বপ্রথম কফি উৎপাদন করেন। 

১৮৪৩ সালে এক ফ্রান্স নাগরিক সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে কফি তৈরির মেশিন আবিষ্কার করেন। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাৎসরিকভাবে ২৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় কফি দিবস পালন করা হয়। 

জানাগেছে-বিশ্বের প্রায় ৭০টি  দেশে কফি ফলের গাছ জন্মে। 

সবুজ কফি বিশ্বের সব থেকে বেশি বিক্রীত কৃষিপণ্যের মধ্যে একটি। 

আমেরিকার নাগরিকগণ প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন কাপ কফি পান করে। 

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পানকারীদের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ২৩%-৬৭% ঝুঁকি কমার তথ্য পাওয়া গেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন তিন কাপ করে কফি পান হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম। 

এ ক্যাফেইন রক্তের এলডিএল (ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল) কমাতে এবং এইচডিএল (উপকারী কোলেস্টেরল) বৃদ্ধি করতে ভূমিকা রাখে। যারা এসবের ঝুঁকিতে আছেন, তাদের প্রতিদিন চার কাপ কালো কফি পান খুবই উপকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

চমকিত খবরটি হলো কফি পানে সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি কমপক্ষে ৫ শতাংশ কমতে পারে। যারা দিনে ২-৩ কাপ কফি পান করেন তাদের ১০ শতাংশ এবং যারা ৪-৫ কাপ কফি পান করেন তাদের ১৪ শতাংশ মৃত্যুঝুঁকি কমে।

গবেষণা বলছে, আত্মহত্যা প্রবণতা কমায় কফি! 

কমপক্ষে দুই লাখ মানুষের ওপর গবেষণার পর হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষকরা জানিয়েছেন, নিময় করে প্রতিদিন কফি পান করলে মানুষের ভেতরের জঘন্য এ প্রবণতা অনেকাংশেই হ্রাস পায়। 

গবেষকদের মতে, কফির মধ্যে থাকা ক্যাফিন নামক রাসায়নিক যৌগটি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে সাময়িকভাবে হলেও চনমনে করে তোলে। যার মাধ্যমে মানুষের হতাশা দূর হয়ে যায়। মানুষ বেঁচে থাকার আনন্দ ও উচ্ছাস পায়। 

ডিউক-এনইউএস গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল স্কুল সিঙ্গাপুর ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা পরিচালনা করে গবেষকরা বলেছেন, প্রতিদিন ২ কাপ বা তার বেশি কফি পান লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে অবধারিত মৃত্যুর ঝুঁকি ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত  হ্রাস করে।  ‘হেপাটোলজি’ সাময়িকীতে গবেষণা প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছে। 


আচ্ছা এবার পরিচিত হওয়া যাক কফির জন্য বিখ্যাত পৃথিবীর আটটি শহরের সাথে। 

লন্ডন - এসপ্রেসোকে ভিন্ন মাত্রায় এনে অসিস এবং কিউস শহরে ফ্ল্যাট হোয়াইট এবং ক্যাপাচিনোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। 

মেলবোর্ন- কফি যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ মেলবোর্নবাসীর।  মেলবোর্ন শহরে আপনার ভালো লাগবে না এমন কফি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। 

আয়্যারল্যান্ড- স্ক্যান্ডানেভিয়ানদের মাথাপিছু কফি গ্রহণের হার পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। 

রোম- ইতালিয়ান সংস্কৃতির একটি অংশ কফি। হাতে গুণে কয়েকজনকে পাওয়া যাবে যারা কফি খান না। 

সিঙ্গাপুর - সিঙ্গাপুরের জীবনযাত্রায় সবসময়ই অংশ হয়ে আছে কফি। 

সিয়াটল- আমেরিকার ছোট অংশ সিয়াটলের ক্যাপিটল হিলে ভিকট্রোলা কফি রোস্টারস, কলাম্বিয়া সিটিতে ইম্পায়ার স্প্রেসো এবং সিটেল কফি ওয়ার্কসে আপনি খুঁজে পাওয়া যাবে পছন্দের স্প্রেসো এবং ক্যাপাচিনো। 

ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া-    ভিয়েনার ঐতিহ্য হিসেবে ২০১১ সালে ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত হয় কফি। 

ওয়েলিংটন, নিউজিল্যান্ড- ওয়েলিংটনে বাড়িতে, অফিস-আদালতেও আপ্যায়ন করার জনপ্রিয় উপকরণ কফি। 

কফি নিয়ে গবেষণার যেন অন্ত নেই। গবেষণায় দেখা যায়, চার কাপ বা তার বেশী কফি পান তেমন ক্ষতিকর নয়। তবে আপনার যদি এতো বেশী কফি পানের অভ্যাস না থাকে তবে হুট করে চার কাপ কফি পান শুরু করে দেবেন না, তাতে হিতে বিপরীতও হতে পারে। 

তবে যারা নিয়মিত কফি পান করতে অভ্যস্ত, তাদের জন্য সুখবর, কফি পানের অভ্যাস  কয়েক ধরণের স্কিন ক্যান্সার থেকে নিরাপত্তা। তবে আগে জানা দরকার দিনে কত কাপ কফি নিরাপদ? গবেষকেরা বলছেন, দিনে চার কাপের বেশি কফি পান না করাই ভালো। বিজ্ঞানীরা বলছেন,  দৈনিক দুই থেকে তিন কাপ কফি পান আসলে খারাপ নয়। 


  • জেনে রাখা ভাল সব জিনিসেরই ভাল-মন্দ দুটি দিক থাকে। যুক্তরাজ্যের দি গ্রেন হাসপাতাল ব্রিসটলের কনসালটেন্ট সার্জন এবং ওজন কামানোর বিশেষজ্ঞ স্যালি নরটন, ক্যাফেইন গ্রহণের সুবিধা অসুবিধার সম্পর্কে বলেছেন- গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, যারা দিনে তিন কাপের বেশি কফি পান করেন তাদের শান্তির ঘুম খুব কমই হয়। 

আরেক গবেষণায়  দেখা গেছে, যারা কফি খান না তাদের থেকে কফি পানকারীদের ৭৯ মিনিট কম ঘুম হয়। তাই ঘুমের সমস্যা থাকলে কফিকে না বলুন। দৈনিক পাঁচ কাপের বেশি কফি খেলে গর্ভধারণের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। 

যদি মা হতে চান, তবে অবশ্যই কফি খাওয়ার পরিমাণ কমাতে হবে। দৈনিক ২০০ মি.গ্রাম ক্যাফেইন শরীরে গেলে গর্ভের শিশুর ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি জন্মক্রটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 

আশার খবরও আছে, ক্যাফেইন যুক্ত বা বিহীন, যেকোনো ধরনের কফি টাইপ টু ডায়াবেটিস রোগের ও কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমায় ঝুঁকি কমায়। লিভার বা যকৃতের মেদ কমাতে ক্যাফেইন কার্যকর ভূমিকা পালন করে। 

শরীর চাঙ্গা করতে ও ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত রাখতে কফি পানের জন্য কিছুটা ভিন্ন সময়সূচির কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। কফি পানে অনেকটাই সতর্ক থাকা ভালো। কারণ এতে রয়েছে ক্রিয়াশীল মাদক ক্যাফেইন। তাই অতিরিক্ত কফি পান, আপনার সাময়িক মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটাতে পারে। 

ক্যাফেইন আসক্তি থেকে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা, নার্ভাসনেস, উত্তেজনা, রাগ, পরিপাকজনিত অবসাদ, পেশিতে টান পড়া, অকারণে কথা বলা, ঘুম না হওয়া, দ্রুত ও অনিয়মিত হার্টবিট ইত্যাদি। তাই কফি পান করার পর যদি এগুলোর মতো উপসর্গ টের পান, তবে এটা কফি ইনটক্সিকেশন হতে পারে। 

সাধারণত ক্যাফেইন মানুষকে উদ্যমী হতে সাহায্য করে, কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় ও ঘুমভাব কাটাতে সাহায্য করে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী কফি পান করতে হবে। দিনে দু'বারের বেশি কফি পান না করাই ভালো। 

(দি হেলথ সায়েন্স, বার্তা সংস্থা এএনআই, ‘হেপাটোলজি’ সাময়িকী অবলম্বনে)

এস এম মুকুল, সমাজ বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক, 


ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি সংঘাতের মূলে যে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৩

ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি সংঘাতের মূলে যে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

ফিলিস্তিনিদের রক্তাক্ত ইতিহাসে ১৪ই মে, ২০১৮ ছিল আরেকটি বিষাদময় দিন। যুক্তরাষ্ট্র সেদিন জেরুসালেমে তাদের দূতাবাস উদ্বোধন করছিল। আর সেদিন গাজা পরিণত হয়েছিল এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের হিসেব অনুযায়ী ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে সেদিন গাজায় নিহত হয় ৫৮ জন। আহত হয় আরও প্রায় তিন হাজার। ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধের পর এক দিনে এত বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণহানির ঘটনা আর ঘটেনি।

সেই দিনটি ছিল ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকী। ১৯৪৮ সালের এই দিনটিতে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ফিলিস্তিনিদের কাছে দিনটি হচ্ছে 'নাকবা' বা বিপর্যয়ের দিন। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি সেদিন ইসরায়েলে তাদের বাড়ী-ঘর থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল। প্রতিবছর দিনটিকে তারা 'নাকবা' দিবস হিসেবেই পালন করেন।

যুক্তরাষ্ট্র যে তাদের দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নিয়ে এসেছে, সেটিও খুবই বিতর্কিত একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে এসে এই পদক্ষেপ নেয়ার পর তা ফিলিস্তিনিদের মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করে।

ফিলিস্তিনিরা মনে করে পূর্ব জেরুসালেম হবে তাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের রাজধানী। অন্যদিকে ইসরায়েল পুরো জেরুসালেম নগরীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নিয়ে কার্যত ইসরায়েলিদের অবস্থানকেই সমর্থন জানাচ্ছে বলে মনে করে ফিলিস্তিনিরা।

ইসরায়েলি আর ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ আট দশকের এই সংঘাত বুঝতে সাহায্য করতে পারে নীচের দশটির প্রশ্নের উত্তর:


১. কীভাবে এই সংঘাতের শুরু?

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপে বসবাসকারী ইহুদীরা ব্যাপক বিদ্বেষ-নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। সেখান থেকেই 'জাওনিজম' বা ইহুদীবাদী আন্দোলনের শুরু। তাদের লক্ষ্য ছিল ইউরোপের বাইরে কেবলমাত্র ইহুদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র পত্তন করা।

সেই সময় প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিন ছিল তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। এটি মুসলিম, ইহুদী এবং খ্রিস্টান- এই তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র ভূমি হিসেবে বিবেচিত।

ইহুদীবাদী আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ইউরোপের ইহুদীরা দলে দলে প্যালেস্টাইনে গিয়ে বসত গাড়তে শুরু করে। কিন্তু তাদের এই অভিবাসন স্থানীয় আরব এবং মুসলিমদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। সেসময় আরব এবং মুসলিমরাই ছিল সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্য কার্যত ভেঙ্গে পড়ে। তখন যে লিগ অব নেশন' গঠিত হয়েছিল, সেই বিশ্ব সংস্থার পক্ষ থেকে ব্রিটেনকে 'ম্যান্ডেট' দেয়া হয় প্যালেস্টাইন শাসন করার।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন চলছিল তখন ব্রিটেন আরব এবং ইহুদী, উভয় পক্ষের কাছেই নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্যালেস্টাইন নিয়ে। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির কোনটিই ব্রিটেন রক্ষা করেনি।

পুরো মধ্যপ্রাচ্য তখন কার্যত ভাগ-বাটোয়োরা করে নিয়েছিল ব্রিটেন আর ফ্রান্স। এই দুই বৃহৎ শক্তি পুরো অঞ্চলকে তাদের মতো করে ভাগ করে নিজেদের প্রভাব বলয়ে ঢোকায়।

প্যালেস্টাইনে তখন আরব জাতীয়তাবাদী এবং ইহুদীবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়। ইহুদী এবং আরব মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে।

এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যেভাবে লাখ লাখ ইহুদীকে হত্যা করা হয় (হলোকাস্ট) তার পর ইহুদীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় চাপ বাড়তে থাকে।

ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা অঞ্চলটি তখন ফিলিস্তিনি আর ইহুদীদের মধ্যে ভাগ করার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরায়েল।

কিন্তু পরদিনই মিশর, জর্দান, সিরিয়া এবং ইরাক মিলে অভিযান চালায় ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা অঞ্চলে। সেটাই ছিল প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। ইহুদীদের কাছে এটি স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত।

জাতিসংঘ প্যালেস্টাইনে আরবদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে অঞ্চলটি বরাদ্দ করেছিল, এই যুদ্ধের পর তার অর্ধেকটাই চলে যায় ইসরায়েল বা ইহুদীদের দখলে।

ফিলিস্তিনের জাতীয় বিপর্যয়ের শুরু সেখান থেকে। এটিকেই তারা বলে 'নাকবা' বা বিপর্যয়। প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে হয়। ইহুদী বাহিনী তাদেরকে বাড়ি-ঘর থেকে উচ্ছেদ করে।

কিন্তু আরব আর ইসরায়েলিদের মধ্যে এটা ছিল প্রথম যুদ্ধ মাত্র। তাদের মধ্যে এক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের সূচনা হলো মাত্র।

১৯৫৬ সালে যখন সুয়েজ খাল নিয়ে সংকট তৈরি হয়, তখন ইসরায়েল মিশরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু সেই সংকটে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ব্রিটেন, ইসরায়েল আর ফ্রান্সকে পিছু হটতে হয়। ফলে যুদ্ধের মাঠ কোন কিছুর মীমাংসা সেই সংকটে হয়নি।

এরপর এলো ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। ৫ই জুন হতে ১০ই জুন পর্যন্ত এই যুদ্ধে যা ঘটেছিল, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল পরবর্তীকালে।

ইসরায়েল বিপুলভাবে জয়ী হয় এই যুদ্ধে। তারা গাজা এবং সিনাই উপদ্বীপ দখল করে নেয় যা কীনা ১৯৪৮ সাল হতে মিশরের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে পূর্ব জেরুসালেম-সহ পশ্চিম তীরও তারা দখল করে নেয় জর্দানের কাছ থেকে। সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করে গোলান মালভূমি। আরও পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়ি-ঘর ফেলে পালাতে হয়।

আরব-ইসরায়েল সংঘাতের ইতিহাসে এর পরের যুদ্ধটি 'ইয়োম কিপুর' যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরের এই যুদ্ধের একদিকে ছিল মিশর আর সিরিয়া, অন্যপক্ষে ইসরায়েল। মিশর এই যুদ্ধে সিনাই অঞ্চলে তাদের কিছু হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করে। তবে গাজা বা গোলান মালভূমি থেকে ইসরায়েলকে হটানো যায়নি।

কিন্তু এই যুদ্ধের ছয় বছর পর ঘটলো সেই ঐতিহাসিক সন্ধি। মিশর প্রথম কোন আরব রাষ্ট্র যারা ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করলো। এর পর তাদের পথ অনুসরণ করলো জর্দান।

কিন্তু তাই বলে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ হলো না। গাজা ভূখন্ড যেটি বহু দশক ধরে ইসরায়েল দখল করে রেখেছিল, সেটি ১৯৯৪ সালে তারা ফিলিস্তিনিদের কাছে ফিরিয়ে দিল। সেখানে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বড় ধরণের লড়াই হয় ২০০৮, ২০০৯, ২০১২ এবং ২০১৪ সালে।

২. মধ্যপ্রাচ্যে কেন ইসরায়েলে প্রতিষ্ঠা করা হয়?

ইহুদীরা বিশ্বাস করে বাইবেলে বর্ণিত পিতৃপুরুষ আব্রাহাম এবং তার বংশধরদের জন্য যে পবিত্রভূমির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, আজকের আধুনিক ইসরায়েল সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই অবশ্য এই ভূমি নিয়ে সংঘাত চলছে। আসিরিয়ান, ব্যাবিলোনিয়ান, পার্সিয়ান, ম্যাসিডোনিয়ান এবং রোমানরা সেখানে অভিযান চালিয়েছে, সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। রোমানরা সেখানে 'জুডেয়া' বলে একটি প্রদেশ তৈরি করেছিল।

তবে এই 'জুডেয়া' প্রদেশের ইহুদীরা বেশ কয়েকবার বিদ্রোহ করেছেন। রোমান সম্রাট হাড্রিয়ানের আমলে ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে এক বিরাট জাতীয়তাবাদী ইহুদী বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। তিনি সে দমন করেন। এরপর তিনি জুডেয়া এবং রোমানদের অধীন সিরিয়াকে যুক্ত করে তৈরি করেন এক নতুন প্রদেশ, যার নাম দেয়া হয় সিরিয়া-প্যালেস্টাইন।

এসব যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে সেখানে ইহুদীদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। সেখানে ইহুদীদের ব্যাপক হারে হত্যা করা হয়। অনেকে নির্বাসিত হয়। অনেক ইহুদীতে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়।

অস্টম শতকে যখন ইসলামের উত্থান ঘটলো, প্যালেস্টাইন জয় করলো আরবরা। এরপর অবশ্য ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা সেখানে অভিযান চালায়। ১৫১৬ সালে এই এলাকায় শুরু হয় তুর্কি আধিপত্য। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এই অঞ্চলটি এক নাগাড়ে শাসন করেছে তারা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লীগ অব নেশন্স প্যালেস্টাইন তুলে দেয় ব্রিটিশদের হাতে। সেখানে ব্রিটিশ শাসন চলেছে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপে যে ইহুদী নিধনযজ্ঞ (হলোকাস্ট) চলে, তার শিকার হন লাখ লাখ ইহুদী। একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এর স্বীকৃতির জন্য তখন আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে।

কিন্তু আরব আর ইহুদীদের মধ্যে এ নিয়ে যে বিরোধ, ব্রিটিশরা তার কোন সমাধান করতে পারছিল না। তারা বিষয়টি নিয়ে জায় জাতিসংঘে। পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখার জন্য জাতিসংঘ একটি বিশেষ কমিশন গঠন করে।

১৯৪৭ সালের ২৯শে নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ প্যালেস্টাইন ভাগ করার এক পরিকল্পনা অনুমোদন করে। এই পরিকল্পনায় একটি আরব এবং একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল আর জেরুসালেম নগরীর জন্য একটি বিশেষ কৌশল গ্রহণের কথা বলা হয়।

পরিকল্পনাটি মেনে নিয়েছিল ইসরায়েল, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করেছিল আরবরা। এই পরিকল্পনাকে আরবরা দেখছিল তাদের ভূমি কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে।

কিন্তু প্যালেস্টাইনের ওপর ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হওয়ার মাত্র একদিন আগে ইহুদীরা ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিল।

পরের দিনই ইসরায়েল জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন জানালো, যা গৃহীত হলো এক বছর পর। জাতিসংঘের ১৯২ টি দেশের ১৬০টি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

৩. ফিলিস্তিনরা দুটি আলাদা ভুখন্ডে ভাগ হয়ে আছে কেন?

১৯৪৭ সালে প্যালেস্টাইন বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ কমিটি সুপারিশ করেছিল একটি আরব রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে "পশ্চিম গ্যালিলি, সামারিয়া এবং জুডেয়ার পার্বত্য অঞ্চল, তবে জেরুসালেম নগরী এবং মিশর সীমান্ত পর্যন্ত ইসডুডের উপকূলীয় সমভূমি এর মধ্যে পড়বে না।"

কিন্তু আজকের ফিলিস্তিনি ভূখন্ডের বিভাজন মূলত নির্ধারিত হয়েছে প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতির রেখা বরাবর।

ওয়েস্ট ব্যাংক বা পশ্চিম তীর (৫,৯৭০ বর্গ কিলোমিটার) এবং গাজা ভূখন্ড (৩৬৫ বর্গ কিলোমিটার) হচ্ছে দুটি প্রধান ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকা। এই দুই ফিলিস্তিনি ভূখন্ডের সবচেয়ে নিকটবর্তী দুটি এলাকার মধ্যে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার।

ওয়েস্ট ব্যাংক বা পশ্চিম তীরকে এই নামে ডাকা হয় কারণ এটি জর্দান নদী এবং ডেড সীর পশ্চিম তীরে। জেরুসালেম পর্যন্ত এর বিস্তার। যে জেরুসালেম নগরীকে কীনা ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি- উভয়েই তাদের রাজধানী বলে দাবি করে।

পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণ করে ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষ। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি সরকার। ধর্মনিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি দল ফাতাহ এই ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষের মূল শক্তি বা দল।

আর গাজার সঙ্গে রয়েছে ইসরায়েলের ৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত। মিশরের সঙ্গেও গাজার ৭ কিলোমিটার সীমান্ত আছে। গাজার অন্যদিকে ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূমধ্যসাগর উপকূল।

গাজা এখন নিয়ন্ত্রণ করে হামাস। ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল হামাস। অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে যে চুক্তি করেছে হামাস তাকে স্বীকৃতি দেয় না।

৪. ইসরায়েলি আর ফিলিস্তিনিরা কি কখনো কোন শান্তি চুক্তি করেছে?

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যখন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি সেখান থেকে উচ্ছেদ হয়ে গেল, তখন ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে পশ্চিম তীর এবং গাজায়। সেখানে ফিলিস্তিনিরা বিভিন্ন দলে সংগঠিত হয়ে সংগ্রাম শুরু করে। গাজা নিয়ন্ত্রণ করতো মিশর। আর পশ্চিম তীর ছিল জর্দানের নিয়ন্ত্রণে। অন্য কিছু আরব দেশেও ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় শিবির তৈরি হয়।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু আগে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো মিলে গঠন করে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গেনাইজেশন (পিএলও)। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল ছিল ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ফাতাহ। পিএলও গঠিত হওয়ার পর এর বাহিনী ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ শুরু করে। প্রথমে তারা হামলা চালায় জর্দান থেকে। এরপর লেবানন থেকে।

ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের নানা ধরণের টার্গেট লক্ষ্য করে এই হামলা চালায়। ইউরোপেও ছিল কিছু টার্গেট। বিমান, দূতাবাস থেকে শুরু করে ইসরায়েলি অ্যাথলীটদের ওপর হামলা চলে।

ফিলিস্তিনিরা একের পর এক ইসরায়েলি টার্গেটে হামলা করছিল। আর ইসরায়েল আবার পাল্টা ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছিল টার্গেট করে। দুপক্ষের এই 'যুদ্ধ' চলে বহু বছর ধরে।

এরপর ১৯৯৩ সালে পিএলও এবং ইসরায়েল একটি শান্তি চুক্তিতে সই করে। অসলো শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত এটি। পিএলও সহিংসতা এবং সন্ত্রাসবাদের পথ পরিহার করে ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে এবং শান্তির অঙ্গীকার করে। তবে হামাস কখনোই এই চুক্তি মানেনি।

চুক্তি অনুসারে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে তাদের দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করে। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ইসরায়েল এই প্রতিশ্রুতি কখনোই বাস্তবায়ন করেনি। তারা বরং অধিকৃত এলাকায় ইহুদী বসতি গড়ে তোলে।

এই ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি শান্তি চুক্তির অধীনেই গঠিত হয়েছিল 'প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল অথরিটি' বা ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষ। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি সরকার।

সরাসরি ভোটে এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন।

জেরুসালেম যদিও ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দ্বন্দ্বের অন্যতম উৎস, তারপরও এই অসলো শান্তি চুক্তিতে জেরুসালেমের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

২০১৫ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে ঘোষণা দেন, তারা আর এই শান্তি চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য নন, কারণ ইসরায়েল এই চুক্তি মেনে চলেনি। তিনি আরও বলেন, একটি দখলদারি শক্তি হিসেবে এখন সবকিছুর দায়িত্ব ইসরায়েলের ঘাড়েই বর্তাবে।

৫. ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের মধ্য বিরোধের মূল বিষয়গুলো কী?

একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব, পশ্চিম তীরে ইহুদী বসতি নির্মাণ অব্যাহত রাখা এবং ফিলিস্তিনি ও ইহুদী এলাকার মধ্যে নিরাপত্ত প্রাচীর তৈরি করা--এগুলি শান্তি প্রক্রিয়াকে বেশি জটিল করে ফেলেছে। যদিও দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালত পশ্চিম তীরে ইহুদী বসতি নির্মাণকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।

কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে শান্তির পথে এগুলোই একমাত্র বাধা নয়। বিল ক্লিনটন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তখন ক্যাম্প ডেভিডে ২০০০ সালে তিনি যে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেখানে এর ব্যর্থতার আরও অনেক কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক এবং ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত সেই বৈঠকে একমত হতে পারেননি আরও অনেক বিষয়ে।

যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য:

জেরুসালেম: ইসরায়েল দাবি করে জেরুসালেমের ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে তারা পূর্ব জেরুসালেম দখল করে নেয়। এরপর থেকে তারা জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী বলে গণ্য করে। কিন্তু এর কোন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে চায়।

সীমান্ত এবং এলাকা নিয়ে বিরোধ: ফিলিস্তিনিরা চায় ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগে যে সীমান্ত ছিল, সেই সীমানার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে। ইসরায়েল এটা মানতে নারাজ।

ইহুদী বসতি: ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল যেসব ফিলিস্তিনি এলাকা দখল করে নিয়েছিল, সেখানে তারা অনেক ইহুদী বসতি গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ। কেবল পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেমেই এখন বসতি গেড়েছে পাঁচ লাখের বেশি ইহুদী।

ফিলিস্তিনি শরণার্থী: ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখান থেকে বাড়ী-ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল লাখ লাখ ফিলিস্তিনি। এরা ইসরায়েলের ভেতর তাদের বাড়ীঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবি করে আসছে। পিএলও'র হিসেবে এই ফিলিস্তিনি এবং তাদের বংশধরদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ছয় লাখ। কিন্তু ইসরায়েল এই অধিকারের স্বীকৃতি দিতে চায় না। তাদের আশংকা, এত বিপুল সংখ্যাক ফিলিস্তিনি যদি ইসরায়েলে ফিরে আসে, তাদের রাষ্ট্রের ইহুদী চরিত্র আর ধরে রাখা যাবে না।

৬. ফিলিস্তিন কি কোন দেশ?

২০১২ সালের ২৯শে নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব ভোটে পাশ হয়। এতে ফিলিস্তিনিদের 'নন মেম্বার অবজারভার স্টেট' বা পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়।

এর ফলে ফিলিস্তিনিরা এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিতর্কে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। তারা জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠাগুলোর কাজেও অংশ নিতে পারে।

২০১১ সালে অবশ্য একটি পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিন জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আপত্তির কারণে সেই চেষ্টা সফল হয়নি।

কিন্তু জাতিসংঘের স্বীকৃতি না মিললেও এই বিশ্ব সংস্থার ৭০ ভাগ সদস্য রাষ্ট্রই ফিলিস্তিনকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। (সাধারণ পরিষদের ১৯২ টি দেশের ১৩৪টি দেশ)।

২০১৫ সালের সেপেম্বরে জাতিসংঘ সদর দফরের বাইরে ফিলিস্তিনি জাতীয় পতাকা উত্তোলনেরও স্বীকৃতি মিলে।

৭. যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসরায়েলের প্রধান মিত্র? আর ফিলিস্তিনের সমর্থক কারা?

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের পক্ষে রয়েছে খুবই ক্ষমতাধর একটি লবি। সেখানে জনমতও ইসরায়েলের পক্ষে। এর ফলে কোন প্রেসিডেন্টের পক্ষে ইসরায়েলেও ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেয়া কঠিন।

২০১৩ সালে বিবিসি ২২টি দেশে একটি জরিপ চালিয়েছিল। সেই জরিপে দেখা যায়, পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে একমাত্র দেশ, যেখানে জনমত ইসরায়েলের পক্ষে সহানুভূতিশীল।

শুধু তাই নয়, এই দুইদেশ ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সাহায্য পায় ইসরায়েল। এই সাহায্যের একটা বড় অংশই খরচ হয় ইসরায়েলের জন্য সামরিক অস্ত্র কেনার জন্য।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনের পক্ষে খোলাখুলি সমর্থন যোগানোর মতে একটি বৃহৎ শক্তিও নেই।

ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস এক সময় মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো। কিন্তু মিশরের সেনাবাহিনী ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যূত করার পর সেখান থেকে হামাস আর কোন সমর্থন পায় না।

হামাসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এখন সিরিয়া, ইরান এবং লেবাননের হেযবোল্লাহ গোষ্ঠী। ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতিশীল বিশ্বের আরও অনেক দেশ। কিন্তু এই সহানুভূতি কাজে পরিণত হয় কম।

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন যে অস্থিরতা, তার কারণেও ফিলিস্তিনিদের ইস্যুটির ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ সরে গেছে।

৮. ফিলিস্তিনি এলাকায় সর্বশেষ দফা সহিংসতার পেছনে কি?

কিছুদিনের তুলনামূলক শান্তির পর গত ১৪ই মে, ২০১৮ হতে আবার ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়েছে গাজায়। সেদিন অন্তত ৫৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয় ইসরায়েলি হামলায়। আহত হয় তিন হাজারের বেশি।

গত ছয় সপ্তাহে একশোর বেশি ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী ইসরায়েলি সৈন্যদের গুলি এবং বোমায় নিহত হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা তাদের এই বিক্ষোভের নাম দিয়েছে 'গ্রেট মার্চ টু রিটার্ন'। অর্থাৎ নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়ার মিছিল।

১৪ই মে ছিল ‌ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকী। আর ফিলিস্তিনিরা সেই দিনটি পালন করে 'নাকবা' বা বিপর্যয় হিসেবে। কারণ ঐ দিনই প্রায় সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলের ভেতর থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল তাদের বাড়িঘর ফেলে।

আর ঠিক এরকম এক স্পর্শকাতর দিনেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাস সরিয়ে নিচ্ছিল জেরুসালেমে। এটি ফিলিস্তিনিদের সাংঘাতিক ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।

ফিলিস্তিনিরা মনে করে পূর্ব জেরুসালেম হবে তাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের রাজধানী। আর যুক্তরাষ্ট্রে তাদের দূতাবাস সেখানে সরিয়ে নিয়ে কার্যত পুরো নগরীরর ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সমর্থন দিচ্ছে।

৯: তাহলে কি এখন আমরা আরেকটি 'ইন্তিফাদা'র সূচনা দেখছি?

ফিলিস্তিনিরা এর আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দুটি গণঅভ্যুত্থান বা 'ইন্তিফাদা' ঘটিয়েছে। প্রথমটি ১৯৮০র দশকে। পরেরটি ২০০০র এর শুরুর বছর গুলিতে।

১৯৮৭ সালের প্রথম ইন্তিফাদার সময় ফিলিস্তিনিরা ছিল কার্যত নিরস্ত্র। ফিলিস্তিনি তরুণ এবং কিশোররা পাথর ছুড়ে ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর মোকাবেলা করছে, এই দৃশ্য অনেক ছবিতেই দেখা যাবে।

২০০০ সাল হতে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় ইন্তিফাদা ছিল অনেক বেশি রক্তাক্ত। তিন হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয় সেই সময়। ইসরায়েলিদেরও হারাতে হয় এক হাজার সৈন্য।

গাজায় সম্প্রতি যে বিক্ষোভ দেখা গেছে তা সেখানে ধূমায়িত হতে থাকা ক্ষোভ এবং হতাশার বহিপ্রকাশ বলে মনে করা হয়। কারণ শান্তি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতিতে ব্যাপকভাবে হতাশ ফিলিস্তিনিরা।

শতাধিক ফিলিস্তিনির প্রাণহানির পর এখন ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তৃতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয় কীনা, সে প্রশ্ন উঠছে। অনেকের ধারণা, এটি গাজা থেকে পশ্চিম তীরেও ছড়িয়ে যেতে পারে।

১০. কী ঘটলে দুপক্ষের মধ্যে টেকসই শান্তি আসবে?

ফিলিস্তিনিদের দিক থেকে দেখলে, এজন্যে প্রথমেই ইসরায়েলকে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকার করে নিতে। এতে হামাসও থাকবে। গাজার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে হবে। পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেমে ফিলিস্তিনেদের চলাফেরার ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি হচ্ছে,এজেন্য আগে সব ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীকে সহিংসতার পথ ত্যাগ করতে হবে এবং রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

এরপর রয়েছে সীমানা এবং ভূমি নিয়ে বিরোধ। আছে ইহুদী বসতি এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ইসরায়েলে ফিরে যাওয়ার অধিকারের প্রশ্ন।

এসব প্রশ্নেও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার দরকার হবে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনেক কিছু্ই বদলে গেছে। বিশেষ করে আরব এবং ইসরায়েলিদের মধ্যে অনেক যুদ্ধের পর বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলির চেহারাই পাল্টে গেছে।

ইসরায়েল যেহেতু অধিকৃত অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণে, তাই এর ভিত্তিতেই দরকষাকষি করতে চায় তারা। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা দাবি করছে, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের আগে যে সীমানা ছিল, সেই সীমানার ভিত্তিতেই তাদের রাষ্ট্র হবে।

আর পশ্চিম তীরে ইসরায়েল যে অবৈধ বসতি নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে, সেটা নিয়ে নীরব লড়াই তো চলছেই।

তবে সবচেয়ে জটিল বিষয় মনে হয় জেরুসালেম নগরীর প্রতীকি গুরুত্ব।

পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং গাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা হামাস, উভয়েই চায় পূর্ব জেরুসালেম হবে তাদের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের রাজধানী। যদিও ইসরায়েল ১৯৬৭ সাল হতে এটি দখল করে রেখেছে।

এই বিরোধের নিরসন ছাড়া হয়তো একটা চূড়ান্ত সমাধান কোনদিনই সম্ভব হবে না। অন্যান্য বিরোধের ক্ষেত্রে হয়তো আপোসের জায়গা আছে, কিন্তু জেরুসালেমের বেলায় নেই।

আর মৃতপ্রায় শান্তিপ্রক্রিয়াকে যে পুনরুজ্জীবিত করা যাবে, সেটাও মনে হচ্ছে না।

সত্যি কথা বলতে কি, সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই পুরোনো বিরোধের মীমাংসার জন্য এত কম চেষ্টা আর কখনো দেখা যায়নি।

আর ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু - এই দুজনের কেউই যে চুক্তিতে পৌছানোর জন্য দরকারি কোন ছাড় দেবেন--সেটা কেউই বিশ্বাস করেন না।


রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে নিহত ৩২

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে নিহত ৩২

ইউক্রেনে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতভর চালানো এই হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। হামলায় বিভিন্ন শিল্প স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে রাশিয়ার চালানো সবচেয়ে ‘নৃশংস’ হামলাগুলোর একটি বলে মন্তব্য করেছেন।

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকি শহরে। সেখানে রাশিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র পাঁচতলা আবাসিক ভবনে আঘাত হানলে ভবনের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে।

ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ বৃহস্পতিবার সকালে জানায়, প্রিলুকিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২২ হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও দুটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। রাজধানী কিয়েভে একটি আবাসিক ভবনে রুশ বিমান হামলার ঘটনায়ও দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এতে কিয়েভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারজনে।

এর আগে ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান ভিহিভস্কি জানিয়েছিলেন, দেশজুড়ে হামলায় ২৮ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রিলুকিতেই মারা যান ২০ জন, যাদের মধ্যে পাঁচজন শিশু।

বুধবার সন্ধ্যায় কিয়েভের একটি শহরতলিতে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আরও দুজন নিহত হন বলে জানিয়েছে দেশটির প্রসিকিউটর কার্যালয়।

জেলেনস্কি জানিয়েছেন, হামলায় সারা দেশে প্রায় ১০০ জন আহত হয়েছেন। রাজধানী কিয়েভ ছাড়াও মধ্যাঞ্চলের ওলেক্সান্দ্রিয়া ও ক্রেমেনচুক শহরেও বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতভর দেশটির বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৭০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে রাশিয়া। এর মধ্যে অনেকগুলো ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। পাশাপাশি কয়েক ডজন শাহেদ ড্রোনও ব্যবহার করা হয়।

জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে এবং শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এই হামলা চালিয়েছে। তিনি এটিকে রাশিয়ার চালানো সবচেয়ে ‘নৃশংস’ হামলাগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেন।

হামলার সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্মদিনের কথাও উল্লেখ করেন জেলেনস্কি। তার ভাষায়, পুতিন নিজেকেই এমন একটি ‘জন্মদিনের উপহার’ দিয়েছেন, যেখানে শিশু ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

প্রিলুকিতে হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়। একটি খননযন্ত্রের পাশাপাশি বহু উদ্ধারকর্মী হাতে কোদাল নিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করেন।

ভবনের যেসব অংশ এখনো দাঁড়িয়ে ছিল, সেগুলোর ওপরের তলায় পৌঁছাতে উদ্ধারকর্মীরা মই ব্যবহার করেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে অন্তত ১৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শহরটিতে প্রায় ৫৫ জন আহত হয়েছেন।

প্রিলুকির উপমেয়র দানিলো সাভেনকো বলেন, শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় ব্যাপক ধ্বংস হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি স্ত্রীকে নিয়ে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান।

ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার এই ব্যাপক হামলা এমন এক সময়ে হলো, যখন দুই দেশের যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে এবং বেসামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স